আমাদের রাহুল মামা – ৬

শুক্রবার

সকালে নাস্তার টেবিলে মামার সাথে দেখা।

% আয় বস, একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। আপা সকাল থেকে কি কারণে যেন ক্ষেপে আছে! মনে হয় দুলাভাইয়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে। আর আমরা যে আজ বাইরে যাব তা তো এখনো বলা হয় নি।

# এখন তাহলে কি হবে ???

* মামা, যা অবস্থা আজ মনে হয় বের হওয়া ঠিক হবে না। এখন কিছু বললে বকা খেতে পারি।

# মামা, কিছু একটা কর। তুমি থাকতে আমাদের এত ভয় কিসের?

% হুম, চল একটা পরিকল্পনা করে ফেলি।

# ওকে মামা।

* ঠিক আছে, তুমি যা বলবে তাই হবে।

% তাহলে আমাদের চিপফুডে যাবার এলগরিদম ঠিক করে ফেলি।

# এটা আবার কি?

% এলগরিদম হল এক ধরনের প্ল্যান বা পরিকল্পনা। আমি প্ল্যান করে তোকে দিলে সেই অনুযায়ী সব করলে কাজটা হয়ে যাবে। আবার তুই আমাদের এই “বাইরে যাবার এলগরিদম” তোর বন্ধুদেরও দিতে পারিস, তাদেরও কাজে আসতে পারে।

# হা হা মজার তো। চল তাহলে কাজ শুরু করি-

% এখন কি কি হতে পারে, সেটা ভেবে, কি কি হলে কি করব তা আগে থেকে ঠিক করে রাখব, যেন আজকের দিনটি আমাদের জন্য ভালো কাটে।

এরপর মামা, স্কেচবুক নিয়ে প্ল্যান করা শুরু করল-

%       

এলগরিদম ১

আপা যদি অনুমতি দেয়
তাহলে আমরা বাইরে যাব।

# কিন্তু আম্মু যদি অনুমতি না দেয় তাহলে আমরা কি করব ??

% আচ্ছা তাহলে –

এলগরিদম ২

আপা যদি অনুমতি দেয়
  তাহলে আমরা বাইরে যাব।
আপা যদি অনুমতি না দেয়
      তাহলে আমরা সারাদিন বাসায় গেমজোনে গেম খেলব।

* আচ্ছা যদি অনুমতি দেয় তাহলে আমরা কি করব ??

% তাহলে এটা হবে আমাদের ৩ নম্বর এলগরিদম, তখন আমরা কিভাবে যাব সেটা ঠিক করবো, তার তা নির্ভর করে আমাদের বাজেটের উপর।  

এলগরিদম ৩

                   যদি ৩০০ টাকার উপরে পাই
                             তাহলে রিক্সায় যাব
                   যদি ২০০ টাকার উপরে পাই
                             তাহলে আমরা অটোকারে যাব
                   যদি ১০০ টাকার উপরে পাই
                             তাহলে আমরা পাবলিক বাসে যাব

# ঠিক আছে, মামা, চল কাজে নেমে পরি।

* কিন্তু মামা, আমরা যদি ৩১০ টাকা পাই তাহলে রিক্সায়, অটোকারে এবং পাবলিক বাসে এই তিনটায়ই করে যেতে হবে। কারণ, ৩১০ তো ১০০,২০০,৩০০ থেকে বড়।

% ও তাই তো। তাহলে এটা ঠিক করতে হবে।

          এলগরিদম৩.১

                   যদি ৩০০ টাকার উপরে পাই
                             তাহলে রিক্সায় যাব
                   যদি ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে পাই
                             তাহলে আমরা অটোকারে যাব
                   যদি ১০০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে পাই 
                             তাহলে আমরা পাবলিক বাসে যাব

# মামা, এখনও তো ঝামেলা আছে-

% আবার কি ঝামেলা ??

# প্ল্যানে ভুল আছে। যদি টাকা না পাই তাহলে কি হবে ???

% মানে যাবার অনুমতি পেয়েছি কিন্তু বাজেট পাশ হয় নি, এমন কিছু?

# ঠিক তাই।

% হুম, ঠিক তাহলে শেষে আরও একটি শর্ত যোগ হবে।

          এলগরিদম ৩.২

                   যদি ৩০০ টাকার উপরে পাই
                             তাহলে রিক্সায় যাব
                   যদি ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে পাই
                             তাহলে আমরা অটোকারে যাব
                   যদি ১০০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে পাই 
                             তাহলে আমরা পাবলিক বাসে যাব
                   আর যদি টাকা না পাই
                             তাহলে পায়ে হেঁটে যাব

# এবার ঠিক আছে।

* চল মামা, আমরা কাজে নেমে পরি।

% আমাদের হাতে এখন ৩ টি এলগরিদম আছে ।  প্রথমটা থেকে দ্বিতীয়টা ভাল। অনুমতি না পেলে কি করব সেটা সেখানে লিখা আছে। আর পেলে কিভাবে বাইরে যাব এটা আছে শেষের এলগরিদমে।

* তাহলে মামা, ৩ নম্বর এলগরিদমটা ২ নম্বর এলগরিদমের ভিতরে।

% হুম সেটাও বলা যায়। এই ঘটনাকে বলে নেস্টেড, মানে একটার ভিতরে আরেকটা।  

# আচ্ছা, কাজ তাহলে সহজ, আম্মুর কাছে বলে টাকা নিয়ে চিপফুডে যাওয়া।

% তা তো আমরা সবাই জানি, নতুন করে বলার কি আছে?

* কিন্তু আম্মু যে ক্ষেপে আছে! এখন উপায়?

% উপায় একটা আছে, সেটা হল তোদের আম্মুর মন ভালো করা।

* কিন্তু সেটা কিভাবে ?

% আমি কি করে বলব! তোরা চিন্তা করে বের কর।

# মামা, চল সবাই মিলে আমরা গান গাই।

* হি হি। তোর গান শুনে আম্মু অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।

# তাহলে! কি যে করব?? মাথায় কিছু আসছে না ।

% আপার মন খারাপ থাকলে কি করে ?

* জানি না, এভাবে কখনও চিন্তা করিনি !

% হুম…। তোদের মন খারাপ থাকলে কি করে ?

# আমার মন খারাপ থাকলে, যেটা খেতে চাই সেটা কিনে দেয়।

% আর ইমি তোর ?

* আমার মন খারাপ থাকলে আম্মু আমাকে অনেক সময় দেয়। কথা বলতে বলতে আমার যে মন খারাপ ছিল সেটাই ভুলে যাই।

% আর তোরা দুইজনই তোদের আম্মুর মন খারাপ হয় কিনা সেটাই বলতে পারিস না। খুব খারাপ! হতাশ হলাম, তোদের দিয়ে কিছু হবে না। যা করার আমাকেই করতে হবে।

# মামা, আমি কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল করেছি। আর সেটা হল আমরা পড়তে বসলে আম্মু অনেক খুশি হয়।

% চমৎকার! যা তোরা এখন পড়তে বস।

* মানে কি ?? আমরা চিপফুডে যাব না ??

% যাব, আর তাই এখন পড়তে বসতে হবে। তোরা যা, আমি যাই আপার সাথে গল্প করে আসি।

আমরা আমাদের ঘরে চলে গেলাম। পড়তে একটুও মন বসছিল না। পড়তে বসলেই আমার শুধু ঘুম পায়। তবে এখন বুঝি কেন ঘুম পায়, আমার মস্তিষ্ক বেশি পরিশ্রম করতে চায় না। একটু ডাটা পেয়েই সেগুলো গুছিয়ে রাখার কাজ শুরু করতে চায়। আর সেটা করতে পারবে আমি ঘুমালে।  মামা একটু পর ড্রয়িং রুম থেকে আমাকে আর ইমি আপুকে ডাকছে।

% এই ইমু আর ইমি এই দিকে আয়, আর কতপড়াশুনা করবি ?

আমি তো অবাক, মামাই তো আমাদের পড়তে বলল আবার মামাই বলছে আর কত পড়াশুনা করবি? মামার ডাকে আমরা দুইজন ড্রয়িং রুমে গিয়ে হাজির।

* মামা কি করব বল, পড়ালেখা ছাড়া এ জীবনে আর কি আছে?

আমি তো আপুর কথা শুনে আরও অবাক! কি বলছে আপু?? কোথায় বলবে পড়তে ভাল লাগে না, বাইরে ঘুরতে যাব। তা না, বলছে পড়ালেখা ছাড়া তার জীবনে নাকি আর কিছু নাই !!

ও বুঝেছি, এটা মনে হয় আম্মুকে খুশি করার জন্য। তাই আমিও যোগ দিলাম-

# মামা, তুমি এখানে বসে বসে সময় নষ্ট না করে তো আমাদের পড়াতেও পার। কত উপকার হত আমাদের।

আড় চোখে তাকিয়ে দেখি, আম্মু আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। প্ল্যান মনে হয় কাজে দিয়েছে।

% চল ইমু তোর ঘরে যাই,  কি বুঝাতে হবে বল। আজ সারাদিন অংক করব আমরা।

বলেই মামা হেসে দিল। আমি আর আপু তো বোকার মত একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছি।  মনে হয় ধরা পড়ে গেছি।

~ হয়েছে আর পড়াশুনা করতে হবে না। মামা তোদেরকে নিয়ে বের হবে, কিন্তু দুপুরের আগে বাসায় ফিরতে হবে।

# হুররে !!!

* মামা, আমি রেডি।

এখন আম্মু আর মামা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হু হু করে হেসে দিল। মনে হয় আমরা ধরা পড়ে গেছি। বলার সাথে সাথে আপু যেভাবে রেডি হয়ে গেল!

~ কি বের হওয়ার জামা পরে কি পড়তে বসেছিলি নাকি ?!

আপুতো এবার লজ্জায় লাল হবার অবস্থা। মামা থাকাতে রক্ষা!

% আপা পরে কথা হবে। সময় কম, দুপুরে আসতে হবে। আর গুড নিউজটা দিয়ে দাও।

~ আরে এটার জন্য তো আমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। তোদের আব্বু আসবে সোমবার, বলে কিনা এক দিনের জন্য আসবে, তাও আবার আগামী শুক্রবার, রাহুল ও থাকবে না আবার তোদের স্কুল ও খুলে যাবে। তাই বিজ্ঞানী আবু মোঃ ইফতেখারের সাথে যুদ্ধ করতে হল। আর তার ফলাফল হল, আমি জয়ী! সোমবার আসছে।

# হুররে! অনেক মজা হবে, আব্বু আসবে আবার মামা ও থাকবে। এই দুইজনকে তো একসাথে পাওয়া অনেক ভাগ্যের ব্যাপার। 

* মামা, আব্বু আসলে তো আমাদের আর পড়াশুনা হবে না ।

% আরে পড়াশুনা করলাম আবার কখন? গল্প করা হবে না।

* ঐ একই। তুমি যে গল্প করে পড়াও সেটা কি আমি বুঝি না নাকি? হি হি …

% হা হা হা, ধরা পরে গেলাম তাহলে ???

* আরে না।এটা তো অনেক মজার, গল্পে গল্পে পড়াশুনা। হি হি…

% চল চল এখন বের হই। পরেরটা পরে দেখা যাবে।

# কিন্তু মামা এটা তো এলগরিদম ২ এর জন্য অনুমতি পেলাম, কিন্তু এরপর ৩.২ বাকি।

% ও তাই তো।

* তো মামা, আমরা কত টাকা বাজেট পেলাম?

% ২৮০ টাকা।

* তার মানে আমরা অটোকারে যাচ্ছি?

% ঠিক তাই।

এরপর আমরা আর সময় নষ্ট না করে বের হয়ে গেলাম। মাত্র ১৪ মিনিটে পৌঁছে গেলাম চিপফুডে।

% ইমি, তোর ছক্কার জন্য কি কি করতে হবে মনে আছে ???

* মামা, আমরা খাবার অর্ডার দিলে পয়েন্ট পাব, আমার আর ৭ পয়েন্ট লাগবে।

% ঠিক আছে। তাহলে তোরা কে কি খাবি অর্ডার দে, আমি খাব “ফ্রাইড চিকেন স্লাইস”।

আমি আর আপু মিলে কিছুই ঠিক করতে পারছি না, আবার মামা এখানে সাহায্য করল। ঠিক হল আমরা সবাই পিজ্জা খাব, নতুন এক পিজ্জা এসেছে “ব্লু পিজ্জা”[1]। এটা আমরা কেউ খাই নি আগে। এখানে না আসলে হয়তো জানতামই না যে এমন নামের কোন পিজ্জা হয়। যাইহোক, এখন অর্ডার দেয়ার পালা। মামা ওয়েটারকে ডাকল।

% এই মামা, আমাদের অর্ডারটা নিয়ে যান।


[1] ব্লু পিজ্জা (কাল্পনিক), খাবার

আরো গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published.